আবদুল্লাহ » আঠার

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০০:৩৭
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০০:৩৭
দৃষ্টিপাত
হালিমাকে সঙ্গে লইয়া আবদুল্লাহ্ যখন গৃহে ফিরিল, তখন মাতা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন। বহুদিন তিনি কন্যাকে দেখেন নাই; ইতোমধ্যে তাহার একটি পুত্রও হইয়াছে। স্বামীর মৃত্যুতে তিনিও দারুণ শোক পাইয়াছেন, এক্ষণে শোকের ও আনন্দের যুগপৎ উচ্ছ্বাসে অধীর হইয়া কন্যাকে কোলে টানিয়া লইয়া কাদিতে লাগিলেন, আবার পরক্ষণেই তাহার পুত্রটিকে বক্ষে চাপিয়া ...

হালিমাকে সঙ্গে লইয়া আবদুল্লাহ্ যখন গৃহে ফিরিল, তখন মাতা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন। বহুদিন তিনি কন্যাকে দেখেন নাই; ইতোমধ্যে তাহার একটি পুত্রও হইয়াছে। স্বামীর মৃত্যুতে তিনিও দারুণ শোক পাইয়াছেন, এক্ষণে শোকের ও আনন্দের যুগপৎ উচ্ছ্বাসে অধীর হইয়া কন্যাকে কোলে টানিয়া লইয়া কাদিতে লাগিলেন, আবার পরক্ষণেই তাহার পুত্রটিকে বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া অশ্রুসিক্ত মুখে হাসিয়া ফেলিলেন। কিন্তু সে যখন তাহার অজস্র চুম্বনে অস্থির হইয়া কাঁদিয়া ফেলিল, তখন তিনি তাহাকে ভুলাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন; তাহাকে কোলের উপর নাচাইয়া কাক, বিড়াল, মুরগি, যাহা যেখানে ছিল, সব ডাকিয়া, এটা ওটা সেটা দেখাইয়া তাহাকে হাসাইয়া দিলেন।

কিন্তু এ আনন্দের মধ্যেও তাহার মনের কোণে দুইটি কারণে দুঃখের কুশাঙ্কুর বিধিয়া রহিল, –বউ আসে নাই, সে এক কারণ, আর আবদুল্লাহর পড়ার কোনো বন্দোবস্ত হইল না, সেই আর এক কারণ। আবদুল্লাহর শ্বশুর তো সাহায্য করিতে রাজি হইলেন না; মীর সাহেব যদিও সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছেন বলিয়া আবদুল্লাহর মুখে শুনিলেন, কিন্তু সে সাহায্য গ্রহণ করা ভালো বিবেচনা করিলেন না। সুতরাং আর কোনো উপায় নাই; আবদুল্লাহ্কে চাকরির সন্ধানেই বাহির হইতে হইবে। আবার বাহির হইতে হইলে কিছু খরচপত্র চাই, তাহারও যোগাড় করা দরকার; এই সকল কথা ভাবিয়া মাতা বড়ই অস্থির হইয়া উঠিলেন।

কয়েকদিন ধরিয়া ভাবিয়া ভাবিয়া টাকা সংগ্রহের কোনো উপায় স্থির করিতে না পারিয়া শেষে পুত্রকে ডাকিয়া কহিলেন, –বিদেশে যাবি বাবা, কিছু টাকা তো হাতে রাখতে হয়! তা আমার যা দুই একখানা গয়না আছে সেগুলো বেচে ফেল্!

আবদুল্লাহ্ কহিল, –কীই বা এমন আছে, আম্মা, ওগুলো না হয় ঘর বলে থাক। আমি যোগাড় করে নেবখন…।

কোথা থেকে যোগাড় করবি, বাবা?

হালিমা কহিল, –আমার হাতে কিছু আছে, ভাইজান, আমি দিচ্ছি।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –না, না, ও টাকা থাক, সময়-অসময়ে কাজে লাগবে…

হালিমা বাধা দিয়া কহিল, –তা বেশ তো, আপনার অসময় পড়েছে, ভাইজান, তাই তো কাজে লাগাতে চাচ্ছি। কেন মিছিমিছি ধার-কর্জ কত্তে যাবেন; এই টাকাই নেন, তারপর খোদা যদি দিন দেন, তখন না হয় আবার আমাকে দেবেন।

মাতাও হালিমার এই প্রস্তাবে মত দিলেন। অগত্যা তাহাকে ভগ্নীর নিকট হইতেই টাকা লইতে রাজি হইতে হইল।

স্থির হইল, সে প্রথম কলিকাতায় গিয়া তাহাদের পুরাতন মেসে বাসা লইবে এবং চাকরির সন্ধান করিবে। আবদুল্লাহ্ আশা করিয়াছিল, কলিকাতায় গেলে নিশ্চয়ই একটা কিনারা করিতে পারিবে। সে বিশাল নগরীতে শত-সহস্র লোক উপার্জন করিতেছে, চেষ্টা করিলে তাহারও কি একটা উপায় হইবে না! আশায়, উৎসাহে সে কলিকাতায় যাইবার আয়োজন করিতে লাগিল।

এমন সময় বরিহাটী হইতে আবদুল কাদেরের এক পত্র আসিল। অনেক দিন পরে তাহার পত্র পাইয়া আবদুল্লাহ্ ক্ষিপ্রহস্তে খুলিয়া এক নিশ্বাসে পড়িয়া ফেলিয়া, আম্মা, আম্মা, হালিমা, হালিমা বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে বাড়ির ভিতর ছুটিয়া আসিল। তাহার ব্যস্ততা দেখিয়া মাতা তাড়াতাড়ি রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী, কী, আবদুল্লাহ্, কী হয়েছে?

আবদুল কাদেরের চাকরি হয়েছে, আম্মা!

আলহামদো লিল্লাহ্! কী চাকরি পেয়েছে, বাবা?

সব্‌রেজিস্ট্রার হয়েছে–এখন উমেদারি কচ্ছে, তাতেও মাসে কুড়ি টাকা করে পাবে, এর পরে পাকা চাকরি পেলে মাসে এক শ কি দেড় শও পেতে পারে।

শুনিয়া মাতা খোদার কাছে হাজার হাজার শোকর করিতে লাগিলেন। হালিমা তাহার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়া শুনিতেছিল; আনন্দে তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। শ্বশুরালয়ে একেবারেই তাহার মন টিকিত না; এইবার খোদার ফজলে স্বামীর যখন চাকরি হইয়াছে, তখন নিজের সংসার গুছাইয়া পাতিয়া লইয়া পছন্দমতো থাকিতে পারিবে, ইহাই মনে করিয়া সে মনে মনে একটা সোয়াস্তি অনুভব করিল।

মাতা একটু ভাবিয়া কহিলেন–তা তুইও ওই চাকরির চেষ্টা কর না বাবা!

আবদুল্লাহ্ কহিল, সেও তো তাই লিখেছে, আর আমাকে বরিহাটীতে যেতেও বলেছে। কিন্তু ওদিকে গেলে যে আর পড়াশুনা করা যাবে না। আমার ইচ্ছে, মাস্টারি করে বি-এ পাস করি। বিএ পাস কত্তে পাল্লে ও সবরেজিস্ট্রারির চাইতে ঢের ভালো চাকরি পাওয়া যাবে–আর না হলে ওকালতিও তো করা যাবে।

সংসারের উপস্থিত টানাটানির কথা ভাবিয়া মাতা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন; কিন্তু পুত্রের সঙ্কল্পের কোনো প্রতিবাদ করিলেন না। কহিলেন, –আচ্ছা, বাবা, যা ভালো বোঝ, তাই কর। খোদা এক রকম করে চালিয়ে দেবেন।

এদিকে আবদুল্লাহর রওয়ানা হইবার সময় নিকট হইয়া আসিয়াছে। সে তাড়াতাড়ি আবদুল কাদেরের পত্রের জবাব লিখিয়া ফেলিল। তাহাতে পিতার মৃত্যু সংবাদ হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার শ্বশুরবাড়ির ঘটনা এবং চাকরির সন্ধানে কলিকাতায় যাওয়ার বন্দোবস্তের কথা পর্যন্ত মোটামুটি লিখিয়া দিল এবং কলিকাতায় গিয়া কোথায় থাকিবে, কী করিবে, না করিবে সে সকল বিষয় সেখানে গিয়া পরে জানাইবে, তাহাও বলিয়া রাখিল।

যাত্রাকালে মাতা কহিলেন, –একটা খোশ-খবর নিয়ে যাত্রা করলি বাবা, খোদা বোধহয় ভালো করবেন। বিসমিল্লাহ বলিয়া আশায় বুক বাঁধিয়া আবদুল্লাহ রওয়ানা হইয়া গেল।

কিন্তু যে আশা ও উৎসাহ লইয়া আবদুল্লাহ্ কলিকাতায় আসিল, দুদিনেই তাহা ভঙ্গ হইয়া গেল। কোনো স্কুলেই মাস্টারি জুটিল না। কলিকাতায় এক মাদ্রাসা ভিন্ন তখন আর মুসলমান স্কুল ছিল না; সেখানে একটা চাকরি খালি পাইয়াও, আর একজন বিহারবাসী উমেদারের বিপুল সুপারিশের আয়োজনের সম্মুখে সে তিষ্ঠিতে পারিল না।

এইরূপে কয়েক মাস বেকার কাটিয়া গেল। হালিমা যে কয়টি টাকা দিয়াছিল, তাহাও প্রায় ফুরাইয়া আসিল, অথচ উপার্জনের কোনোই কিনারা হইল না। এদিকে আবদুল্লাহ কাহারো বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজও খুঁজিতেছিল। কিন্তু মুসলমানগণের ঘরে বড়জোর পাঁচ টাকায় আপারা এবং উর্দু পড়াইবার কাজ মিলিতে পারে; তাও আবার ইংরেজি-পড়া লোক দেখিলে লোকে আমল দিতে চায় না। যাহা হউক অনেক অনুসন্ধানের পর অবশেষে মীর্জাপুরের জনৈক ধনী চামড়াওয়ালার বাড়িতে আহার ও বাসস্থানসহ পনর টাকা বেতনে দুইটি বালকের শিক্ষকতা পাইয়া আবদুল্লাহ্ আপাতত হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল।

কিন্তু গৃহশিক্ষকের কাজ করিয়া বি-এ পাস করিবার সুযোগ পাওয়া যাইবে না। প্রাইভেট দিতে হইলে কোনো স্কুলে মাস্টারি করা চাই; আর কলেজে পড়িতে গেলে এ সামান্য বেতনে চলা কঠিন, তবে যদি ফ্রি স্টুডেন্ট হইতে পারে, তাহা হইলে ওই পনরটি টাকা হইতে অন্তত বারটি করিয়া টাকা মাসে মাসে মাকে পাঠাইতে পারিবে। কিন্তু এ বৎসর আর সময় নাই; এখন এইভাবেই চলুক; আগামী গ্রীষ্মের বন্ধের পর কোনো কলেজে ফ্রি পড়িবার জন্য চেষ্টা করা যাইবে। আর ইতোমধ্যে যদি একটা মাস্টারি কোনো স্কুলে জুটিয়া যায়, তবে তো কথাই নাই; নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া প্রাইভেট পরীক্ষা দিতে পারিবে।

সৌভাগ্যক্রমে চাকরির জন্য আবদুল্লাহকে অধিক দিন বসিয়া থাকিতে হইল না। কলিকাতায় আসার পর সে আবদুল কাদেরের সহিত রীতিমতো পত্র ব্যবহার করিতেছিল। ইতোমধ্যে তাহার নিকট হইতে সংবাদ পাইল যে বরিহাটীর গভর্নমেন্ট স্কুলে একজন মুসলমান আন্ডারগ্রাজুয়েট চাই, বেতন চল্লিশ টাকা। বিলম্বে ফসকাইয়া যাইতে পারে, সুতরাং আবদুল্লাহ্ যেন পত্রপাঠ চলিয়া আসে।

আবার আবদুল্লাহর মন আশার আনন্দে নাচিয়া উঠিল। সেইদিন রাত্রের মেলে রওয়ানা হইয়া পর দিন বরিহাটীতে গিয়া উপস্থিত হইল। আবদুল কাদের তাহাকে দেখিয়া এত খুশি হইল যে, সে আবদুল্লাহূকে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া কহিল, –ভাই, খোদার মরজিতে যদি তুমি এ চাকরিটা পাও, তবে আমরা দুজনে এক জায়গাতেই থাকতে পারব।

আবদুল্লাহ কহিল, –দাঁড়াও ভাই, আগে পেয়েই তো নিই। তুমি যে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল গোছ কচ্ছ।

আরে না না, শুনলাম এবার নাকি ডিরেক্টার আপিস থেকে চিঠি এসেছে, একজন মুসলমান নিতেই হবে। আর ক্যান্ডিডেট কোথায়? থাকলেও ভয় নেই খোদার ফজলে। আমাদের মুন্সী সাহেবের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের খুব খাতির–আর তিনিই স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট কিনা। ও এ্যাপয়েন্টমেন্ট তারই হাতে। মুন্সী সাহেবকে সঙ্গে দিয়ে তোমাকে কালই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি, দাঁড়াও।

আবদুল কাদেরের আশাপূর্ণ কথায় আবদুল্লাহ্ মনে মনে অনেকটা বল পাইল। সে ভাবিল, –চল্লিশ টাকা তাহার জন্য এখন খুবই যথেষ্ট হইবে; বাসা খরচ পনর টাকা করিয়া লাগিলেও পঁচিশ টাকা সে মাকে পাঠাইতে পারিবে–আর আবদুল কাদেরও হালিমাকে মাসে মাসে পাঁচটি করিয়া টাকা পাঠাইতেছে। ওঃ, খোদা চাহে তো সংসারের আর কোনোই ভাবনা থাকিবে না।

এইরূপ কল্পনা-জল্পনা করিতে করিতে আবদুল্লাহ আহারাদি করিয়া একখানি দরখাস্ত লিখিয়া হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করিতে চলিল। স্কুলে উপস্থিত হইয়া জনৈক ভৃত্যকে হেডমাস্টারের কামরা কোথায় জিজ্ঞাসা করিল। সে একবার আবদুল্লাহর আপাদমস্তক ভালো করিয়া দেখিয়া লইয়া কহিল, –একখানা কাগজে নাম এবং কী জন্য দেখা করিতে চাহেন তাহা লিখিয়া দিতে হইবে। আবদুল্লাহ্ তাহাই লিখিয়া দিল। কিছুক্ষণ পরে ভৃত্যটি আসিয়া তাহাকে হেডমাস্টারের কামরায় লইয়া গেল।

আবদুল্লাহ্ কামরায় প্রবেশ করিতেই হেডমাস্টার চেয়ার হইতে উঠিয়া সবেগে তাহার সহিত করমর্দন করিলেন এবং হাতমুখ নাড়িয়া অদ্ভুত বিকৃত উচ্চারণে বলিয়া ফেলিলেন, আইয়ে জনাব, বয়ঠিয়ে, আপ কাঁহা সে আসতে হ্যাঁয়?

আবদুল্লাহ্ বিনয়ের সহিত কহিল, –স্যার, আমি বাঙালি, আমার সঙ্গে বালাতে কথা বলতে পারেন।

হেডমাস্টার একটু ঘাড় নিচু করিয়া তাহার নাসিকার মধ্যস্থিত চশমাটির উপর হইতে আবদুল্লাহর দিকে নেত্রপাত করিয়া কহিলেন, –ওঃ হো! আপনি বাঙালি? বেশ, বেশ, আপনার পোশাক দেখে আমি ঠাউরেছিলাম যে, আপনি দিল্লি কিংবা লাহোর না হোক, অন্তত ঢাকা কিংবা মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে এসেছেন; সেখানকার নবাব ফ্যামিলির লোকেরা এই রকমই পোশাক পরেন কিনা!

আবদুল্লাহ্ একটুখানি হাসিয়া কহিল, –কেন, মুসলমানেরা সব জায়গাতেই তো এই রকম আচকান আর পায়জামা পরে…।

কই মশায়, আমি তো দেখতে পাই এখানে কেউ টুপিটা পর্যন্ত পরে না। তা এরা সব—এই–ছোটলোক কিনা, চাষাভুষো; এসব পোশাক ওরা কোত্থেকে পাবে!

আবদুল্লাহ কহিল, হ্যাঁ, তা সম্ভান্ত লোকমাত্রেই এইরকম পোশাক ব্যবহার করেন…

তা বৈকি! তবে আপনাদের মতো সম্ভ্রান্ত লোক এ অঞ্চলে কটিই বা আছেন!

আবদুল্লাহ্ একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, –মশায়ের কাছে একটা দরবার নিয়ে এসেছিলাম…

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি বুঝি এই পোস্টটার জন্যে স্ট্যান্ড কত্তে চান? তবে কি জানেন, এতে মাইনে অতি সামান্য, প্রসপেক্টও কিছু নেই, আপনাদের মতো লোকের কি আর এসব চাকরি পোষাবে? আমি তাই ভাবছি।

আমাদের অবস্থা নিতান্ত মন্দ স্যার। বি-এ পড়ছিলাম, হঠাৎ আমার ফাদার মারা গেলেন, কাজেই আর পড়াশুনো হল না, আর এখন চাকরি ছাড়া সংসার চালাবার উপায় নেই…

ওঃ বটে? তবে তো বড়ই দুঃখের বিষয়! তা আপনি একটু চেষ্টা কল্লে খুব ভালো চাকরিই পেতে পারেন। ডিপুটি না হোক, সব্‌ডিপুটি তো চট করে হয়ে যাবেন। কেন মিছিমিছি এই সামান্য মাইনের চাকরি করবেন, এতে না আছে পয়সা, না আছে ইজ্জত…

আমার তেমন মুরব্বি নেই স্যার, আর ডিপুটি সবুডিপুটি ওসব বি-এ পাস না হলে হয় না…

কে বলেছে আপনাকে? আপনাদের বেলায় ও-সব কিছুই লাগে না। একবার গিয়ে দাঁড়ালেই হল। আজকাল যে সব গভর্নমেন্ট সার্কুলার বেরুচ্ছে, মুসলমান হলেই সে চাকরি পাবে, তা কি আপনি জানেন না?

শুনেছি বটে, কিন্তু মুসলমান হলেই তো হয় না; উপযুক্ত যোগ্যতা থাকা চাই, আবার যোগ্য লোকদের মধ্যেও কমপিটিশন আছে। যার ভালো সুপারিশ নেই, তার পক্ষে যোগ্য হলেও ওসব বড় চাকরির আশা করা বিড়ম্বনা।

হেডমাস্টার বামপার্শ্বস্থ জানালার বাহিরে দৃষ্টিস্থাপন করিয়া টেবিলের উপর অঙ্গুলির আঘাত করিতে করিতে কহিলেন, –ভুল ভুল! এমনি করেই আপনারা নিজেদের প্রসপেক্ট মাটি করেন।

তাহার পর আবদুল্লাহর দিকে চাহিয়া কহিলেন, –আমি আপনার ভালোর জন্যেই পরামর্শ দিচ্ছিলাম, একটু চেষ্টা কল্লেই আপনি এর চেয়ে ভালো চাকরি পেতেন। সরেজিস্ট্রারিও তো মাস্টারির চাইতে অনেক ভালো। এই তো সেদিন আপনাদেরই জাতের একজন সব্‌রেজিস্ট্রারি পেয়ে গেল, সে তো ফোর্থ ক্লাস পর্যন্তও পড়ে নি। এক কলম ইংরেজি লিখতে পারে না, কওয়া তো দূরের কথা। হাতের লেখাও একেবারে ছেলে মানুষের মতো, তবু সাহেব কেবল মুসলমান দেখেই তাকে চাকরি দিয়েছেন।

আপনি কি আবদুল কাদেরের কথা বলছেন, –এই মাস তিন চার হল এপ্রেন্টিস্ হয়েছে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, তারই কথা বলছি–আপনি তাকে জানেন তা হলে?

জানি একটু একটু।

তবে দেখুন দেখি, সে এই বিদ্যে নিয়ে চাকরিটা পেলে, আর আপনি বি-এ পর্যন্ত পড়ে ডিপুটি হতে পারবেন না!

তার সম্বন্ধে বোধহয় আপনি ঠিক খবর পান নি, স্যার। সে এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়েছে, আর এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়া অনেক হিন্দুই যখন সরেজিস্ট্রার হতে পেরেছেন, তখন সে হিসেবে আবদুল কাদেরকে তো অযোগ্য বলা যায় না। আর এদিকে সে ইংরেজিও খুব ভালোই জানে, হাতের লেখাও চমৎকার। এই দেখুন, তার একখানা চিঠি আমার পকেটে ছিল, পড়ে দেখতে পারেন।

হেডমাস্টার চিঠিখানি পরম আগ্রহের সহিত হাত বাড়াইয়া লইলেন এবং ঘাড় উঁচু করিয়া দূর হইতে চশমার ভিতর দিয়া গভীর মনোযোগের সহিত চিঠিখানি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিলেন। পরে চশমার উপর দিয়া আবদুল্লাহর দিকে তাকাইয়া কহিলেন, বটে? এ তো দেখছি বেশ লেখা! আর ইংরেজিও খাসা; কে বলতে পারে এন্ট্রান্স পড়া লোকের লেখা! একেবারে বি-এ পাসের মতো বলেই বোধ হচ্ছে! আমি নিশ্চয়ই আর কারুর কথা শুনেছিলাম। কী জানেন, আপনাদের নামগুলো সকল সময় মনে থাকে না, তাই কার কথা। শুনি আর কাকে মনে করি। তা যাক, আপনি তা হলে এই পোস্টের জন্যেই এ্যাঁপ্লাই করবেন, স্থির করেছেন?

হ্যাঁ, সার এ্যাপ্লিকেশন ও সঙ্গে এনেছি। বলিয়া আবদুল্লাহ দরখাস্তখানি পেশ করিল। হেডমাস্টার সেখানি এক নজর দেখিয়া লইয়া টেবিলের উপর চাপা দিয়া রাখিলেন এবং কহিলেন–বেশ, এখন রইল আপনার এ্যাপ্লিকেশন । এখনো এ্যাপয়েন্টমেন্টের দেরি আছে। সময়মতো খবর পাবেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –তবে এখন উঠি, স্যার। দয়া করে মনে রাখবেন, এটা পেলে আমার বড় উপকার হবে।

তা নিশ্চয়ই আপনাকে আর ও সম্বন্ধে কিছু বলতে হবে না, আমার যতদূর সাধ্য আপনার জন্যে চেষ্টা করব।

আবদুল্লাহ্ তাহাকে ধন্যবাদ দিয়া বিদায় হইল। সেদিন সন্ধ্যার পর আকবর আলীর বৈঠকখানায় আবদুল্লাহর উমেদারির প্রথম অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে আলোচনা চলিতেছিল। হেডমাস্টারের সঙ্গে তাহার যে সকল কথাবার্তা হইয়াছিল তাহা সবিস্তারে শুনিয়া আকবর আলী কহিলেন, — আপনি খুব টিকে গিয়েছেন, যা হোক।

আবদুল্লাহ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, — টিকে গেলাম কেমন?

লোকটার চেষ্টা ছিল, আপনাকে খুব আমড়াগাছী করে ও ছোট চাকরি যাতে আপনি নিতে না চান তাই করা। দেখুন না, প্রথমেই আপনাকে নবাব ফ্যামিলির সঙ্গে তুলনা করে দিল–তারপরে বললে, মুসলমান হলেই বড় চাকরি পায়, পাসটাসের দরকার হয় না–

এইসব শুনেটুনে হয়তো আপনার মাথা ঘুরে যেত…।

তা আমাকে ভোগা দিয়ে ওঁর কী লাভ? এ পোস্টে তো মুসলমানই নেবে বলে এ্যাঁভার্টাইজ করেছে…

তা করুক। যদি মুসলমান ক্যান্ডিডেট কেউ এ্যাঁপ্লাই করে, তা হলে তো শেষটা হিন্দুই ওটা পাবে।

আবদুল্লাহ্ এতটা তলাইয়া দেখে নাই। এক্ষণে আকবর আলী সাহেবের নিকট গূঢ়ার্থ অবগত হইয়া সে একেবারে আশ্চর্য হইয়া গেল। রাত্রে শুইয়া শুইয়া সে অনেকক্ষণ ভাবিল, পরস্পর সহৃদয়তার এমন অভাব যেখানে সেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করে কেমন করিয়া? আর যদি সে এ চাকরি পায়, তাহা হইলে এরূপ লোকের অধীনে কাজ করিয়া তো সুখ পাইবে না! যা হোক, খোদা যা করেন, ভালোই করিবেন, এই বলিয়া সে আপাতত মনকে প্রবোধ দিল।

পরদিন আকবর আলী তাহাকে সঙ্গে লইয়া ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে গেলেন। সাহেব কোনো অঙ্গীকারে আবদ্ধ হইতে পারিলেন না, তবে যদি যোগ্যতর লোক না পাওয়া যায়, তাহা হইলে আবদুল্লাহর বিষয়ে বিবেচনা করিবেন বলিয়া ভরসা দিলেন। আবদুল্লাহ্ সেই রাত্রেই কলিকাতায় ফিরিয়া গেল।

যথাসময়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কুঠিতে কমিটির অধিবেশন হইল। ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, হেডমাস্টার সেক্রেটারি এবং একজন ডিপুটি, একজন উকিল ও একজন স্থানীয় জমিদার, এই তিনজন বাকি মেম্বর। আবদুল্লাহ্ ব্যতীত আর একজন মাত্র মুসলমান দরখাস্ত দিয়াছে; সে লোকটি এফ-এ পাস এবং কিছুদিন অন্যত্র মাস্টারিও করিয়াছে। হেডমাস্টার তাহাকেই উপযুক্ত বলিয়া পছন্দ করিলেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আবদুল্লাহকেই অধিক যোগ্য বলিয়া মত দিলেন। হেডমাস্টার কহিলেন–উহার শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু ইহার নাই। সাহেব কহিলেন, এ ব্যক্তি বি-এ পর্যন্ত পড়িয়াছে, সুতরাং ও ব্যক্তি অপেক্ষা কিছু বিদ্বান, এবং ইহার হাতের লেখাও সুন্দর, দেখিলে লোকটিকে বেশ দক্ষ বলিয়া ধারণা হয়। তাহার পর তিনি মেম্বরগণের মতামত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন যে, তাহার মতের অপেক্ষা না করিয়া মেম্বরগণ স্বাধীনভাবে মত দিতে পারেন। অবশ্য যাহার পক্ষে ভোট অধিক হইবে, সেই চাকরি পাইবে, তা সাহেব নিজে যাহাকেই পছন্দ করুন না কেন! ফলে কিন্তু মেম্বরত্রয় সাহেবের মতেই মত দিয়া ফেলিলেন। আবদুল্লাহ্ চাকরি পাইল।

কুঠি হইতে বাহিরে আসিয়া পথে চলিতে চলিতে জমিদার বাবুটি হেডমাস্টারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি সাহেবের বিরুদ্ধে ও লোকটার জন্যে এত উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন কেন। হেডমাস্টার কহিলেন, –আরে মশায়, আপনারা কেউ আমার দিকে ভোট দিলেন না, তা আর কী করব! আমারই ভুল হয়ে গেল। আর সাহেব যে ওর দিকে ঝুঁকে পড়বেন, তা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। আগে থেকে আপনাদের যদি একটু বলে রাখি, তা হলে আজ ভোটে ঠিক মেরে দিয়েছিলাম মশায়। সাহেব লোক ভালো, মেম্বরদের মত দেখলে তিনি কখনই জেদ কত্তেন না।

উকিল বাবুটি জিজ্ঞাসা করিলেন, –তা ও দু ব্যাটাই তো নেড়ে, ওর আবার ভালো মন্দ কী? একটা হলেই হল।

হেডমাস্টার কহিলেন–আরে না মশায়, এর ভেতর কথা আছে। এ-লোকটা পি-এল লেকচার কমপ্লিট করেছে, এখন একজামিন দিয়ে পাস কল্লেই চাকরি ছেড়ে দেবে, আমি সঠিক খবর জানি। ছেড়ে দিলে একটা প্লি হত, নেড়েগুলো স্টিক করে না তাতে কাজের বড় ডিসলোকেশন হয়। তারপর নিজেদের একটা লোক নেওয়া যেত।

উকিল বাবুটি একটু আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, –আপনি একটু আগে কেন বলেন নি? আমরা তো এর কিছুই জানি নে। জানলে নিশ্চয়ই এর জন্যে ভোট দিতাম। বলা উচিত ছিল আপনার আগে।

হেডমাস্টার কহিলেন, কে জানে মশায়, এত গণ্ডগোল হবে! ভেবেছিলাম, আমি যাকে ফিট বলে দেব, সাহেব তাতেই রাজি হবে। যাক, ওর বরাতে আছে, আমি কী করব!

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান