আবদুল্লাহ » ত্রিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০১:০৩
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০১:০৩
দৃষ্টিপাত
মগরেবের কিঞ্চিৎ পূর্বে মীরসাহেব মসজিদে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া বাহিরে আসিয়াছেন, এমন সময় দুইটি লোক বৈঠকখানার বারান্দা হইতে নামিয়া আসিয়া একেবারে তাহার পা জড়াইয়া করুণস্বরে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, আমাগোর সর্বনাশ হয়ে গেছে হুজুর, এ্যাঁহোন আপনি যদি বাঁচান তো বাঁচি! হঠাৎ এইরূপ আক্রান্ত হইয়া মীরসাহেব ত্রস্তভাবে পা টানিয়া লইলেন এবং ...

মগরেবের কিঞ্চিৎ পূর্বে মীরসাহেব মসজিদে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া বাহিরে আসিয়াছেন, এমন সময় দুইটি লোক বৈঠকখানার বারান্দা হইতে নামিয়া আসিয়া একেবারে তাহার পা জড়াইয়া করুণস্বরে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, আমাগোর সর্বনাশ হয়ে গেছে হুজুর, এ্যাঁহোন আপনি যদি বাঁচান তো বাঁচি!

হঠাৎ এইরূপ আক্রান্ত হইয়া মীরসাহেব ত্রস্তভাবে পা টানিয়া লইলেন এবং কহিলেন, আর কে? বসির মাঝি? কী, কী, হয়েছে কী?

বসির কহিল, আর কী হবে হুজুর, সর্বনাশ হয়ে গেছে, আর কী কব! লাও ডুবে গেছে, খোদা জানডা বাঁচাইছে, আর কিস্সু নেই!

এ্যাঁ! নৌকো ডুবে গেছে? কোথায়? কেমন করে ডুবল?

ম্যাগনায়। পাট বোজাই করে নে যাতিছেলম, আটশো ট্যাহার পাট হুজুর! আমার যথাসর্বিশ্যি, হুজুর! অইন্দে গোনে এট্টা বাকের মুহি মস্ত এট্টা ইষ্টিমার আস্যে পড়ল, সামাল দিতে পাল্লাম না! লার পর দে চলে গেল, সোতের মুহি সবই ভাইসে গেল!

মীরসাহেব পরম দুঃখিত চিত্তে বলিয়া উঠিলেন, ওহো!

বসির চক্ষের জলে বক্ষ ভাসাইয়া কহিতে লাগিল, হুজুর, কিস্সু বাঁচাতি পালাম না! গহিন গাঙ, তাতে আঁদার রাত, লারও ঠিকানা কত্তি পালাম না। কমে ভাইসে গেল কিছুই ঠাওর করি পালাম না! এ্যাঁহোন উপায় কী হুজুর? আমার যে আর কিসু নেই।

মীরসাহেব গভীর সহানুভূতির সহিত কহিলেন, তাই তো বসির! তোমার তো বড়ই বিপদ গেছে দেখছি। বলিয়া বৈঠকখানার তক্তপোশের উপর উঠিয়া বসিলেন। বসির এবং তাহার সঙ্গের লোকটিও বারান্দায় উঠিয়া একটু দূরে মাটির উপর বসিয়া পড়িল।

বসিরের সঙ্গের লোকটি তাহার নৌকার একজন মাল্লা। সে কিয়ৎক্ষণ গালে হাত দিয়া বসিয়া চিন্তাকুলভাবে আপন মনে কহিতে লাগিল, নাইয়ার নাও গেল, মাহাজোনের ট্যাহা। গেল, হের লাইগা কিসু না; কিন্তু–উ কাণ্ডহান অইল কী?

বসির কহিল, এ্যাঁহোন আমি লাইয়্যারেই বা কী বুজ দি, আর হুজুরির ট্যাহারই বা কী করি! আমি ধোনে-পরানে মলাম রে আল্লাহ্!

মীরসাহেব কহিলেন, আমার টাকার জন্য তুমি ভেবো না, বসির। তোমার সঙ্গে আমার অনেক দিনের কারবার! তোমাকে সৎ লোক বলেই জানি। তুমি তো আর ইচ্ছে করে আমার টাকা মার নি! খোদার মরজি সবই–তার উপর তো কারুর কোনো হাত নেই।

এমন সময় একখানি গরুর গাড়ি করুণ কাতর রবে ক্লান্ত মন্থরগতিতে আসিয়া মীরসাহেবের বাড়ির সম্মুখে দাঁড়াইল। আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি গাড়ি হইতে নামিয়া আসিল, মীর সাহেবও বৈঠকখানার বারান্দা হইতে নামিয়া আসিতে আসিতে কহিলেন, এস এস, বাবা; এত দেরি যে?

আবদুল্লাহ্ কদমবুসি করিয়া কহিল, পথে একটা মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলাম–তা পরে বলবখন। আমার চিঠি পেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, আজ সকালেই পেয়েছি। বড় খুশি হলাম যে তুমি আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এলে তোমার পত্র পড়ে অবধি খোদার কাছে হাজার হাজার শোকর কচ্ছি।

তবিয়ত ভালো তো?

হ্যাঁ, বাবা, ভালোই আছি।

আমি মনে করেছিলাম হয়তো আপনি বাড়িতে নেই…

না থাকবারই কথা বটে–কিন্তু থেকে যেতে হয়েছে। বোধ করি তুমি আসবে বলেই খোদা আমাকে বাড়ি থেকে বেরুতে দেন নি। বলিয়া মীরসাহেব স্মিতমুখে আবদুল্লাহর স্কন্ধে হাত দিলেন।

আবদুল্লাহ্ও হাসিমুখে কহিল, তা বেশ হয়েছে, আপনি আছেন, ফুপাজান! নইলে আমার ভারি অসুবিধে হত।

মীর সাহেব কহিলেন, এস, ঘরে এস। নামাযটা পড়ে নি। ওযুর পানি চাই?

জি না, পথেই আসর পড়ে নিয়েছি। ওযু আছে।

অতঃপর মীরসাহেব গাড়োয়ানকে জিনিসপত্র তুলিয়া রাখিতে বলিয়া এবং বসিরকে বসিবার জন্য ইশারা করিয়া আবদুল্লাহকে লইয়া নামায পড়িবার জন্য বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন। উলফৎ কিঞ্চিৎ পূর্বে আলো দিয়া গিয়াছিল।

নামায বাদ মীর সাহেব অন্দরে গিয়া আবদুল্লাহর জন্য কিঞ্চিৎ নাশতার বন্দোবস্ত করিতে বলিয়া আসিলেন। একটু পরেই একটা বাঁদী নাশতার খাঞ্চা চিলমচি, বদনা দস্তরখানা প্রভৃতি একে একে লইয়া আসিল। মীরসাহেব খানপোষ উঠাইয়া ফেলিলেন; খাঞ্চার উপর এক রেকাবি সমুসা, এক তশতরি কুমড়ার মোরব্বা, এক তশতরি আণ্ডার হালুয়া ছিল, তিনি সেগুলি একে একে দস্তরখানে সাজাইয়া দিলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আপনিও আসুন, ফুপাজান…

আমার তো এ সময়ে খাওয়া অভ্যাস নেই–তবে বসি তোমার সঙ্গে একটু–এই বলিয়া মীরসাহেব আবদুল্লাহর সহিত নাশতা করিতে বসিয়া গেলেন।

ফুপাজান তো একলা মানুষ; তবে এসব নাশতা কোথা হইতে আসিল? আবদুল্লাহর কৌতূহল হইল; সে জিজ্ঞাসা করিল, এগুলো কে তয়ের করেছে; ফুপাজান?

মীর সাহেব কহিলেন, কেন, ভালো হয় নি?

না, না, ভালো হবে না কেন? বেশ চমৎকার হয়েছে। তবে আপনার এখানে এসব নাশতা তয়ের করার তো কেউ নেই, তাই জিজ্ঞেস কচ্ছিলাম…

মীর সাহেব একটু হাসিয়া কহিল, ওঃ, তা বুঝি জান না? আমার এক আম্মা এসেছেন যে!

কে? ভাবী সাহেবা?

না মালেকা, আমার ছোট আম্মা।

কবে এলেন তিনি?

এই কদিন হল। মইনুদ্দীন মারা গেছে তা বোধহয় জান…

কই না! কবে?

এই পূজার ছুটির কদিন আগেই। হঠাৎ কলেরা হয়েছিল।

আবদুল্লাহ্ কেবল একবার অহো! বলিয়া অত্যন্ত বিষমুখে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

মীর সাহেব বলিতে লাগিলেন, মেয়েটা বিধবা হয়ে একেবারে নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছিল– বুবুও তো আর নেই যে তার কাছে এসে থাকবে…

কেন, ভাসুর বুঝি জায়গা দিলেন না?

দিয়েছিলেন; কিন্তু দুই জায়ে বনল না। কাজেই তিনি বাধ্য হয়ে মালেকাকে আবদুল খালেকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

কেন, বনল না কেন? মালেকার তো ছেলেপিলে নেই, নির্ঝঞ্ঝাট…

সে জন্যে না; অত বড় ঘরের মেয়ে–সৈয়দজাদী, বাপ জমিদার আবার সজজ– জজিয়তিও মধ্যে মধ্যে করে থাকেন তিনি কি আর সামান্য গেরস্তের মেয়ের সঙ্গে ঘর কত্তে পারেন?

হ্যাঁ, তা ঠিক ফুপাজান! শুনেছি তিনি স্বামীকেও বড় একটা কেয়ার করেন না…

আরে কেয়ার করা তো দূরের কথা; তিনি স্বামীর কথায় নাকি বলে থাকেন, ওঃ এ্যাঁয়সা ডিবৃটি কেত্তা মেরা বাপকা জুতা সাফ কবৃনে কে লিয়ে রাখৃখা গিয়া হায়!

বটে? তবে তো মহীউদ্দিন সাহেব খুব সুখেই ঘর কচ্ছেন!

হ্যাঁ! সুখ বলে সুখ? বাড়িতে তিনি যে কী হালে থাকেন, তা শুনলে কান্না আসে। তার বাসন, পেয়ালা, গেলাস, বদনা সব আলাদা। তিনি যে গেলাসে পানি খান, বিবি সাহেব সে গেলাস ছোঁনও না…

এতদূর!

এই বোঝ! মস্ত ভয়ঙ্কর বড় ঘরের মেয়ে–স্বামী হলেই-বা কী, তার সঙ্গে তুলনায় সে তো ছোটলোক।

আবদুল্লাহ একটু ভাবিয়া কহিল, মহীউদ্দিন সাহেব তো নিতান্ত যে-সে লোক নন। বেশ খাস সম্পত্তি আছে, পুরোনো জমিদারের ঘর–তার উপর ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, –এতেও যদি তিনি ছোটলোক হলেন, তবে ও বিবি সাহেবের তুল্য স্বামী পেতেন কোথায়? আর যদি এতই ছোটলোক বলে ওঁরা বিবেচনা করেন, তবে বিয়ে না দিলেই হত!

বিয়ে দিয়েছিলেন মহীউদ্দিনের বাপ অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে–বড় ঘরে ছেলের বিয়ে দিয়ে কৃতার্থ হবেন, সেই জন্য আর কি! জজ সাহেবও দেখলেন, এমন ছেলে আর পাবেন। না, কাজেই তিনি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, বেচারা মহীউদ্দিন সাহেবের জন্যে বড় দুঃখ হয়।

মীর সাহেব কহিলেন, বরাতে দুঃখু থাকলে আর কে কী করবে বল! সে কথা থাক, এখন মালেকার একটা গতি করতে হয়, তাই ভাবছি।

কী কত্তে চান?

ফের বিয়ে দেব, মনে কচ্ছি।

বিয়ে দেবেন? ছেলে পাবেন কোথায়? বিধবার বিয়ের কথা শুনলে সব্বাই শিউরে উঠবে এক্কেবারে!

সত্যিই তাই। আমি আলতাফের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব করিয়েছিলাম। আলতাফ রাজি আছে, কিন্তু তার বাপ শুনে একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল…

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা তো উঠবেনই! আমাদেরও ক্রমে হিন্দুদের দশা হয়ে উঠল আর কি! ভালো মানুষের বিশেষ করে গরিব ভালো মানুষের ঘরে তো আজকাল বিধবাদের বিয়ে হয়ই না।

মীর সাহেব কহিলেন, ও তো হিন্দুদের দেখাদেখি। আর জাত্যাভিমানও আছে। বিধবাদের কথা ছেড়ে দাও, কত আইবুড়ো মেয়েরই বিয়ে হচ্ছে না। এই দেখ না, আমাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই কত মেয়ের বয়স ত্রিশ বছর পার হয়ে গেল, বিয়ে হচ্ছে না। এরা আলমগীর বাদশার অবতার হয়ে এসেছেন কিনা, শাহ্জাদা পাচ্ছেন না, কাজেই শাহজাদীদের বিয়ে হচ্ছে না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আমার শ্বশুর একদিন কার বিয়ের কথায় বলছিলেন, শরীফজাদীর বিয়ের জন্যে আবার এত ভাবনা কেন? না হলেই-বা কী?

চিরকাল আইবুড়ো থাকবে?

তাঁর মতে থাকলেও দোষ নেই–শরাফতির ভেলায় চড়ে ভবসিন্ধু পার হয়ে যাবে।

মীর সাহেব একটু হাসিয়া কহিলেন, খোদা করে যেন সব শরীফজাদীই ওই রকম করে ভবসিন্ধু পার হয়ে যান; তা হলে শরীফগোষ্ঠী নিপাত হবে শিগগির, মুসলমান সমাজও নিস্তার পাবে।

উভয়ে হাসিতে লাগিলেন। মীর সাহেব আবার কহিলেন, দেখ সমাজে বিয়ে-থাওয়া কয়েকটা নির্দিষ্ট ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ–তার বাইরে কথা উঠলে মুরব্বিরা আপত্তি করে বলেন, ওদের সঙ্গে কোনো পুরুষে হসব-নসব নেই। অর্থাৎ যাদের সঙ্গে ইতিপূর্বে হসব নসব হয় নি, তারা যেন সবই অ-জাত! এই রকম করে কেবল আপনা-আপৃনির মধ্যেই শাদি-বিয়ে অনেক পুরুষ ধরে চলে আসছে। আর তার ফলে শারীরিক, মানসিক, সব রকম অধঃপাত হচ্চে। শাদি-বিয়ে যত বাইরে বাইরে হবে, বংশাবলি ততই সতেজ হবে। তাই বলে এমন কথা বলি নে যে ভদ্রঘরের ছেলে-মেয়ের সঙ্গে হেলো-চাষার ছেলে-মেয়ের বে থা হোক। দেখতে হবে মানসিক হিসাবে বিশেষ কোনো তফাত না থাকে। মনে কর, তিন চার পুরুষ আগে যারা চাষা ছিল, আজ তাদের বংশে লেখাপড়ার চর্চা হয়েছে, অবস্থা ফিরেছে, স্বভাব-চরিত্র ভালো, বড় বড় সমাজে আমাদের সঙ্গে সমানভাবে মেলামেশা কচ্চে, তাদের সঙ্গে হসব-নসবে কোনো দোষ হতে পারে না। এক কালে চাষা ছিল বলে যে রোজ কেয়ামত পর্যন্তই তাদের বংশ ঘৃণিত হয়ে থাকবে, তার কোনো মানে নেই। আর যারা নতুন উন্নতি কচ্চে, তাদের সঙ্গে রক্তের সংমিশ্রণ হলে আজ-কালকার শরীফজাদাদের নিস্তেজ রক্ত একটু সতেজ হয়ে উঠবে–আর এদের বংশানুক্রমিক উৎকর্ষেরও কিছু ফল ওরা পাবে– সুতরাং উভয় পক্ষেরই লাভ।

আবদুল্লাহ্ কহিল, কিন্তু বিলেতের মতো সভ্য দেশেও লর্ড ফ্যামিলির লোকেরা সাধারণ লোকের সঙ্গে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না।

মীর সাহেব কহিলেন, জাত্যাভিমান তাদের মধ্যেও আছে। কিন্তু তাদের আছে বলেই যে সেটা ভালো বলে মেনে নিতে হবে, তার কোনো মানে নেই। যখন দেখতেই পাচ্ছি আমাদের নিজেদের সমাজে এই রকম আপনা-আপনির ভিতর বিবাহের ফল ভালো হচ্ছে না, অনেক স্থলেই সন্তান রোগা, নিস্তেজ, বোকা এইসব হচ্চে আর যেখানেই একটু বিভিন্ন রক্তের সংমিশ্রণ হচ্ছে, প্রায়ই সেখানে দেখতে পাই সন্তান সতেজ, সবল এবং মেধাবী হয়ে ওঠে, তখন আর কোনো যুক্তিই মানতে চাই না। আবার দেখ, মুরব্বিদের। মুখে শুনেছি, সেকালে নাকি বাড়ি বাড়ি লোকজনে ভরা ছিল, তারা বলেন, দুনিয়া আখের হয়ে এসেছে, তাই এখন সব বিরান হয়ে উঠছে! লোকসংখ্যা যে মোটের উপর বাড়ছে, সেটা তারা খেয়াল করেন না; শরীফদের ঘর উজাড় হয়ে আসছে, এইটেই কেবল লক্ষ্য করেন। তা উজাড় তো হবেই! মেয়েগুলোকে কেউ কেউ আইবুড়ো করে রাখেন আর নিতান্তই বে দেন তো সে আপনা-আপনির মধ্যে, যার ফল ভালো হয় না–বিধবা হলে। আর বে দেবেন না; এত করে আশরাফ সমাজে লোক বাড়বে কী করে? এ আশরাফ সমাজের আর মঙ্গল নেই। আর দুই-এক পুরুষের মধ্যেই এঁদের দফা শেষ হবে; আর এখন যাদের দেখে এঁরা নাক সিটকাচ্ছেন, তারাই তখন মানুষ হয়ে তাদের সমাজকেই বড় করে তুলবে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, সে কথা ঠিক, ফুপাজান। এই তো দেখতে পাই, কলকাতার মেসগুলোতে আমাদের এদিককার যত ছাত্র আছে, তার মধ্যে আশরাফ সমাজের ছেলে খুবই কম। লেখাপড়া শিখে ওরা যখন মানুষ হবে তখন এঁরা কোথায় থাকবেন?

সাএলের দলে গিয়ে ভিড় বাড়াবেন। এখনো যদি এঁরা জাত্যাভিমান ছেড়ে, অন্যান্য উন্নতিশীল সমাজের সঙ্গে হসব-নসব কত্তে আরম্ভ করেন, তা হলে এঁদের বংশের উন্নতি হতে পারে। নইলে ক্রমেই অধঃপাত! যাক সে কথা বলছিলাম মালেকার বিয়ের কথা। বাদশাহ্ মিয়া তো কিছুতেই রাজি হবেন না। ভাবছি কোনো উপায় কত্তে পারি কি না। আলতাফ ছেলেটা ভালো; বি-এ পাস করেছে, ল পড়ছে। বারে বেশ শাইন কত্তে পারবে। দেখি যদি একান্ত না হয় অন্য কোথাও চেষ্টা কত্তে হবে। তুমিও একটু সন্ধানে থেকো, বাবা।

আবদুল্লাহ্ কহিল, জি আচ্ছা, তা দেখব। তবে আশরাফ সমাজে ছেলে পাওয়া যাবে বলে বোধ হয় না…

নাই-বা হল আশরাফ সমাজে। ছেলে ভালো, সচ্চরিত্র, সুস্থ, সবল–বাস, আর কোনো সিফাৎ চাই নে। ডিপুটি তমিজউদ্দিনের কথা শুনেছ তো? তার বাপ তো সুপারি, নারকোল, তরিতরকারি মাথায় করে নিয়ে হাটে বেচতেন। ছেলে যখন বি-এ পাস কল্লে, তখনো তিনি তার নিজের ব্যবসায় ছাড়েন নি। হাইকোর্টের উকিল আবদুল জলিল ছেলেটাকে ভালো দেখে নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া শিখিয়ে ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট করে নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। তমিজউদ্দিন মারা গেছেন, তার ছেলে বদরউদ্দীন এখন ওকালতি কচ্ছেন, দিব্বি পসার। দেখ তো, একটা নিম্নস্তরের পরিবারের কেমন ধা করে উন্নতি হয়ে গেল! আর ওই ছেলে যদি ওই সহানুভূতিটুকুর অভাবে লেখাপড়া শিখতে না পেত তবে বাঙ্গালাদেশে তো আজ একটা উন্নত পরিবার কম থেকে যেত! ওসব শরাফতের মোহ ছেড়ে দেও বাবা। ছেলে ভালো পাও আমাকে এনে দেও, তা সে যেমন। ঘরেরই হোক না কেন। কেবল দেখা চাই, ছেলেটি সুস্থ, সচ্চরিত্র আর কর্মক্ষম কি না– বাস্…

আর লেখাপড়া?

হ্যাঁ, সেটা তো চাই-ই…

তবে আপনি বংশটা একেবারেই দেখবেন না? মনে করুন এমনও তো হতে পারে যে, ছেলেটি সব বিষয়ে ভালো, কিন্তু তাদের পরিবারের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা নেই, culture নেই, নিম্নশ্রেণীর লোকের মতনই তাদের চাল-চলন–কেবল ছেলেটি লেখাপড়া শেখবার সুযোগ পেয়ে বি-এ পাস কত্তে পেরেছে। তার সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিলে তো মেয়েকে নিতান্ত হীন সংস্রবে জীবন কাটাতে হবে…

মীর সাহেব কহিলেন, আমি কি আর সে কথা ভেবে দেখি নি বাবা? তেমন ঘরের কথা আমি বলছি নে। অবশ্য তাও দোষের হয় না যদি ছেলেটি পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থাকে–যেমন ধর, তাকে যদি সারাজীবন চাকরিতে বা ব্যবসায় উপলক্ষে বিদেশে বিদেশে কাটাতে হয়। আর তা ছাড়া শিক্ষিত লোকের মধ্যে আজকাল একটা tendency দেখা যাচ্ছে। পরিবারের একান্নবর্তিতা ভেঙে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হয়ে থাকবার দিকে। কাজেই তেমন ক্ষেত্রে মেয়েকে কোনো অসুবিধায় পড়বার কথা নয়। যেখানে পরিবার একান্নবর্তী সেখানে অবশ্য। কেবল ছেলে দেখলে চলে না, এ কথা মানি। তবে কবরের ওপারের দিকে তাকাবার আমি কোনো দরকার দেখি না…

আবদুল্লাহ্ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কবরের ওপারে কী রকম?

মীর সাহেব কহিলেন, অর্থাৎ যারা আছে, তাদের দেখ, তাদের পূর্বপুরুষরা কী ছিল না ছিল দেখবার দরকার নেই…

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা না দেখলে কি যারা আছে তাদের চরিত্র, চালচলন সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়?

কেন যাবে না? তাদের একটু study করে দেখে নিলেই হল। তা ছাড়া তুমি কি মনে কর ঘরানা হলেই চরিত্র, চালচলন ভালো হবে? স্ত্রীকে ধরে মারে এমন হতভাগা শরীফজাদা কি নেই?

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা তো বটেই।

তবে বুঝেই দেখ, যে ছেলেটিকে চাই, তাকে আর তার immediate environment, কেবল এই দেখব; তার ওদিকে দেখব না…! তুমি একটু বস বাবা–বাইরে দুটো লোক বসিয়ে রেখে এসেছি, তাদের বিদায় করে আসি… এই বলিয়া মীর সাহেব উঠিয়া বাহিরে আসিলেন, এবং কহিলেন, দেখ বসির, তোমার ও টাকা আমি মাফ করে দিলাম। যখন ডুবেছে, তখন তোমারও গেছে, আমারও গেছে। তা যাক্‌ তুমি কাল এসো; যদি খোদা তোমাকে দেয়, তবে ও টাকা শোধ কোরো। কিছু টাকা দেব, ফের কারবার কোরো। এখন রাত হল, বাড়িতেও মেহমান। তোমরা আজ এস গিয়ে।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান