আবদুল্লাহ » ঊনত্রিশ

পাতা তৈরিঅক্টোবর ১৭, ২০২০; ০১:০২
সম্পাদনাঅক্টোবর ১৭, ২০২০, ০১:০২
দৃষ্টিপাত
রাত্রি প্রায় ৯টার সময় বিলগাঁ স্টেশনে গাড়ি থামিল। আবদুল্লাহ জিনিসপত্র লইয়া নামিয়া পড়িল। এইখান হইতে গরুর গাড়ি করিয়া তাহাকে অনেকটা পথ যাইতে হইবে। রাত্রে গাড়িতে যাওয়া যাইবে না–একটা হোটেলে থাকিতে হইবে; পরদিন প্রাতে গাড়ি ছাড়িলে সন্ধ্যার পূর্বেই রসুলপুর পৌঁছিতে পারিবে। স্টেশনের বাহিরেই কয়েকটা হোটেল আছে। আবদুল্লাহ্ তাহারই একটাতে গিয়া উঠিল। ...

রাত্রি প্রায় ৯টার সময় বিলগাঁ স্টেশনে গাড়ি থামিল। আবদুল্লাহ জিনিসপত্র লইয়া নামিয়া পড়িল। এইখান হইতে গরুর গাড়ি করিয়া তাহাকে অনেকটা পথ যাইতে হইবে। রাত্রে গাড়িতে যাওয়া যাইবে না–একটা হোটেলে থাকিতে হইবে; পরদিন প্রাতে গাড়ি ছাড়িলে সন্ধ্যার পূর্বেই রসুলপুর পৌঁছিতে পারিবে।

স্টেশনের বাহিরেই কয়েকটা হোটেল আছে। আবদুল্লাহ্ তাহারই একটাতে গিয়া উঠিল। সঙ্গে জিনিসপত্র বেশি ছিল না, একটা তোরঙ্গ, একটা বিছানার মোট আর একটা বদনা। হাত-মুখ ধুইবার জন্য জল চাহিলে হোটেলওয়ালা একটা কুয়া দেখাইয়া দিল। আবদুল্লাহ বদনাটা লইয়া কুয়ার নিকটে গেল এবং এক বালতি জল উঠাইয়া বদনা ভরিয়া জল আনিয়া বারান্দার এক প্রান্তে ওযু করিতে বসিল। হোটেলে আরো অনেক যাত্রী ছিল; আবদুল্লাহকে ওযু করিতে দেখিয়া তাহাদের মধ্য হইতে কয়েকজন উঠিয়া ওযু করিবার জন্য কুয়ার ধারে গেল। ইতোমধ্যে আবদুল্লাহ্ ওযু সারিয়া জায়নামাজ বাহির করিল এবং হোটেল ঘরটির এক কোণে গিয়া নামাযে খাড়া হইল, ক্রমে আরো দুই-চারি জন যাত্রী ওযু করিয়া আসিয়া, কেহ তাহার দক্ষিণ পার্শ্বে, কেহ পশ্চাতে, কেহ উড়ানী, কেহ স্কন্ধস্থিত রঙিন রুমাল বিছাইয়া, নামাযে যোগদান করিল।

নামায শেষ হইতে না হইতেই খানা আসিল। প্রথমে একটা শতছিন্ন লম্বা মাদুর মেঝের উপর পাতা হইল, তাহার উপর, মাদুরের অর্ধেক ঢাকিয়া একটা খেরুয়ার দস্তরখান বিছাইয়া দিল। দস্তরখানটিতে যে কয় বেলার ডাল, সুরুয়া, ঘুসা-চিংড়ির খোসা, মাছের দুই-একটা সরু কাটা ইত্যাদি শুকাইয়া লাগিয়া রহিয়াছে, তাহার ঠিকানা নাই।

নামায শেষ করিয়া উঠিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিল, দুই-চারি জন যাত্রী খানার প্রত্যাশায় দস্তরখানে বসিয়া আছে। সেও আসিল, পার্শ্বে চিলমচি ও বদনা ছিল, হাত ধুইয়া লইল; মাদুরের কোন্‌খানটিতে বসিলে মাটি লাগিয়া কাপড় নষ্ট হইবে না, তাহা খুঁজিয়া পাইল না। অবশেষে মাটি-মাদুর নির্বিশেষে এক প্রান্তে তাহাকে বসিয়া পড়িতে হইল। দস্তরখানটির দুর্গন্ধে আবদুল্লাহ্ মনে মনে বিরক্ত হইল বটে, কিন্তু এরূপ দস্তরখানে বসা তাহার পক্ষে নূতন নহে–সচরাচর বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খাইতে গিয়া সে দস্তরখানের দুর্গন্ধে অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল। দরিদ্র মুসলমান ভদ্রলোকেরা পৈতৃক ঠাঁট বজায় রাখিতেই চেষ্টা করিয়া থাকেন; কিন্তু মানসিক নিশ্চেষ্টতার দরুন পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করিয়া চলিবার তৎপরতাটুকু তাহারা হারাইয়া বসিয়াছেন। এরূপ অবস্থায় বেচারা হোটেলওয়ালার আর অপরাধ কী!

ওদিকে যাহারা নামাযে শরিক হইয়াছিল, তাহাদের মধ্য হইতে একে একে সকলে আসিতে লাগিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি লোক টিকিয়া গেল–এদিকে সকলের খানা শুরু হইয়া গিয়াছে, কিন্তু সে লোকটি ঘাড় গুঁজিয়া তাহার রঙিন রুমালটির উপর বসিয়াই রহিল। হোটেলওয়ালা তাড়া দিয়া কহিল, নেও নেও মেয়াসাহেব, ওঠ, উদিক দে গাড়ি আস্যে পড়ল বুঝি। ওই শোন ঘণ্টা পড়তিছে।

বাস্তবিকই স্টেশনে ঘণ্টা পড়িতেছিল; কিন্তু উহা গাড়ি আসিবার ঘণ্টা নহে, রাত্রি দশটার ঘণ্টা। কিন্তু তাহা হইলেও গাড়ির ঘণ্টা পড়িবার আর বড় বিলম্ব ছিল না। বরিহাটী যাইবার গাড়ি সাড়ে দশটায় বিলগায় আসিবে। লোকটা হোটেলওয়ালার তাড়া খাইয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা শুনিয়া ঝটপট মোনাজাত করিয়া উঠিয়া পড়িল এবং দেও, দেও, জলদি খানা দেও বলিতে বলিতে দস্তরখানে আসিয়া বসিল।

হোটেলওয়ালা একটা বড় কাঠের খাঞ্চা ভরিয়া ভাত আনিল এবং কলাই-চটা এনামেলের রেকাবিগুলিতে দুই-তিন থাবা করিয়া ভাত দিয়া গেল। আর একটি লোক সবুজ রঙের লতাপাতা কাটা একটা বড় চিনামাটির পেয়ালা হইতে বেগুন ও ঘুসা-চিংড়ির ঘণ্টা থপথপ্ করিয়া খানিকটা খানিকটা দিয়া যাইতে লাগিল। একটা লোক বলিয়া উঠিল, কই মেয়াসাহেব, একটু নেমক দিলে না?

ওরে হাশেম, নেমক দিয়ে যা রে– বলিয়া হোটেলওয়ালা এক হাঁক দিল। হাশেম নামক ছোকরাটি দৌড়িয়া বাবুর্চিখানার দিকে গেল, কিন্তু একটু পরেই ফিরিয়া আসিয়া কহিল, নেমক তো নেই, বাপজী।

বলিস্ কী রে! নেমক নেই? দৌড়ে যা, দৌড়ে যা, বাজারতে এক পয়সার নেমক নে আয় বলিয়া হোটেলওয়ালা কাপড়ের খুঁট খুলিয়া একটা পয়সা বাহির করিয়া দিল। এ কার্যে অবশ্য তাহার আর হাত ধুইবার কোনো আবশ্যকতা দেখা গেল না।

এদিকে যাত্রীদিগের মধ্যে অনেকে বিনা লবণেই বিসমিল্লাহ্ বলিয়া খাইতে আরম্ভ করিয়া দিল; কিন্তু সেই অতি-নামাযী লোকটি এবং তাহার দেখাদেখি আরো দুই-এক জন কাঁধে রঙিন রুমালওয়ালা লবণ অভাবে বিসমিল্লাহ্ করিতে না পারিয়া হাত গুটাইয়া বসিয়া রহিল। প্রায় আট-দশ মিনিট পরে ছোকরাটি লবণ লইয়া ফিরিয়া আসিল এবং কাগজের ঠোঙা হইতে একটু একটু লবণ তুলিয়া পাতে পাতে দিয়া গেল। তখন রঙিন রুমালওয়ালা একটু নড়িয়া বসিয়া একটু কাশিয়া, তর্জনীটি একবার লবণের উপর চাপিয়া লইয়া সাড়ম্বরে বিসমিল্লাহ্ বলিয়া উহা জিহ্বাগ্রে ঠেকাইয়া, খানা আরম্ভ করিল।

বেগুনের সালুন দিয়া খাওয়া প্রায় শেষ হইল, যাত্রীরা ডাল এবং আরো চারিটি ভাত চাহিতেছে, এমন সময় স্টেশনে ঢং ঢং করিয়া ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। হোটেলওয়ালা কহিল, জলদি খায়্যা লেন মেয়াসাহেবেরা, গাড়ি আস্যে পড়ল।

এ্যাঁ, খাওয়াই যে হল না! কী করি? বলিতে বলিতে পাঁচ-সাত জন উঠিয়া পড়িল। তাড়াতাড়ি হাত ধুইবার জন্য বদনা লইয়া কাড়াকাড়ি পড়িয়া গেল–কেহ-বা কুয়ার দিকে ছুটিল। হোটেলওয়ালা চিৎকার করিয়া কহিল, পয়সা তিন আনার দে যাবেন মেয়া সাহেবরা। ওরে হাশেম, পয়সাডা গুনে নিস…

হাশেম পিতার আদেশ পাইয়া দরজার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। তিন-চার জন লোক তখন হাত ধুইয়া ঘরের বাহির হইতেছিল; তাহারা ট্যাক হইতে পয়সা বাহির করিয়া গনিয়া দিয়া গেল। কিন্তু আরো কয়েকজনের নিকট হইতে পয়সা আদায় করা বাকি, তাহারা গেল। কোথায়? হোটেলওয়ালা অবশিষ্ট আহার-নিরত যাত্রীদিগকে ডাল দিতেছিল; সে কহিল, দেখ তো হাশেম, কুয়োটার কাছে, এ মেয়া-সাহেবেরা কেমন লোক? খানা খায়্যা পয়সা না দ্যেই ভাগতি চায়?

যে লোকটি হোটেলওয়ালার সহিত খাদেমি করিতেছিল, সে ইতোমধ্যে একবার বাবুর্চিখানায় যাইবার পথে কুয়ার ধারে জন তিনেক লোক ধরিয়া পয়সা আদায় করিয়া লইয়াছিল। সে ঘরে আসিয়া হোটেলওয়ালাকে কহিল, মেয়া ভাই, এই লন তিন জনের পয়সা।

হাশেম তিন জনের নিকট হইতে পয়সা আদায় করিয়াছিল। হোটেলওয়ালা গনিয়া দেখিল, সাত জন লোক উঠিয়াছে, কিন্তু পয়সা দিয়াছে ছয় জন। কোন্ লোকটা পয়সা না দিয়া পলাইল? হাশেম কহিল, যে মানুষটা শ্যাষে আইস্যা বসছিল, তারে কিন্তু আমি দেহি নাই। হোটেলওয়ালার ভাই কহিল, আমিও তো দেহি নাই! ওই মানুষটাই ভাগছে বোধ করি। মেয়া ভাই, যাই দেহি ইস্টিশনে গ্যে মানুষটারে ধরি। বলিয়াই সে চলিয়া গেল।

এদিকে সকলে খানা শেষ করিয়া উঠিয়াছে, এমন সময়ে গাড়ি আসিল। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই আবার গাড়ি ছাড়িয়া দিল এবং তাহার একটু পরেই হোটেলওয়ালার ভাই ফিরিয়া আসিয়া কহিল, না, তারে তো ধত্তি পাল্লাম না মেয়া ভাই–বড্ড ফাঁকি দ্যে গেল।

হোটেলওয়ালার পক্ষে এরূপ ফাঁকিতে পড়া কিছু নূতন নহে। সেও তেমনি ঘণ্টা না পড়িলে লোককে ভাত দিত না; সুতরাং অনেককেই আধপেটা খাওয়াইয়া পুরা তিনগণ্ডা পয়সা আদায় করিয়া পোষাইয়া লইত। সে কেবল কহিল, ভালো রে ভালো, এমন মুসল্লি মানুষটা। ওই যে কয়, বোলে মানুষির মাথায় কালো চুল, মানুষ চেনা ভার। তা সত্যি!

প্রাতে একখানি গাড়ি ঠিক করিয়া আবদুল্লাহ্ রওয়ানা হইল। তখন কার্তিক মাস; বর্ষাকাল শেষ হইয়া গেলেও এখনো তাহার জের মিটে নাই। রাস্তার স্থানে স্থানে অনেকটা কাদা জমিয়া আছে; কাজেই গাড়ি অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলিতে লাগিল।

এইরূপে মাঠ পার হইয়া গ্রামের ভিতর এবং গ্রাম পার হইয়া মাঠের ভিতর দিয়া। আবদুল্লাহর গাড়িখানি চলিতে লাগিল। ক্রমে বেলা দ্বিপ্রহর হইয়া আসিল দেখিয়া আবদুল্লাহ গাড়োয়ানকে কহিল, একটা বাজার-টাজার দেখিয়া গাড়ি থামানো হউক, কিছু নাশতা করিয়া লওয়া যাইবে।

গাড়োয়ান কহিল, হুমকির এই গেরামড়ার ওই মুড়োয় বাজার আছে, কাছে এট্টা ভালো পুষ্কর্নিউ আছে, পানি-টানি খাতি পারবেন।

আবদুল্লাহ কহিল, আচ্ছা তাই চল।

যে রাস্তা দিয়া আবদুল্লাহর গাড়ি চলিতেছিল, সেটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। রাস্তাটি বেশ চওড়া ও উচ্চ; কিন্তু সম্মুখস্থ গ্রামের ভিতর দিয়া না গিয়া বাকিয়া গ্রামের বাহির দিয়া গিয়াছে। উহার দক্ষিণ পার্শ্বে গ্রাম এবং বাম পার্শ্বে বিল। গাড়োয়ান কহিল, এ সরকারি রাস্তা দিয়া আর যাওয়া যাইবে না, কারণ বিলের ভিতর খানিকটা রাস্তা নাই, জলে একদম ধুইয়া গিয়াছে। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কায়দাই এরূপ, এক বর্ষায় রাস্তা ভাঙে, আর এক বর্ষার প্রারম্ভে মেরামত হয়। সুতরাং গ্রামের ভিতরকার সঙ্কীর্ণ পথ দিয়াই যাইতে হইবে।

গ্রামের মধ্য দিয়াই গাড়ি চলিল। পথের উভয় পার্শ্বে ঘন বসতিঘরগুলির বারান্দা। একেবারে রাস্তারই উপর। পথ এত সঙ্কীর্ণ যে একখানি গাড়ি চলিলে আর মানুষ পর্যন্ত চলিবার স্থান থাকে না। খানিকদূর গিয়াই আবদুল্লাহ্ দেখিল, সর্বনাশ! এ রাস্তাও খানিকটা ভাঙা, মধ্যে ভয়ানক গর্ত, জল-কাদায় ভরা। ভাঙন অধিক দূর লইয়া নহে, এই হাত পাঁচ-ছয় হইবে। কিন্তু পাড় এমন খাড়া যে, গাড়ি তাহার ভিতর নামানো কঠিন না হইলেও ওঠানো একরূপ অসম্ভব। এক্ষণে উপায়?

গাড়োয়ান কহিল, হুজুর, দেখতিছেন কী? এ হা্বোড়ের মদ্দি দ্যে তো গাড়ি চলবি নে।

তবে কী করা যায়?

গাড়োয়ান একটু ভাবিয়া কহিল, দেহি যদি আর কোনো পথ পাই।

গাড়িখানি ভাঙা রাস্তার কিনারায় দাঁড় করাইয়া রাখিয়া গাড়োয়ান পাড়ার মধ্যে প্রবেশ করিল। আবদুল্লাহ্ গাড়ি হইতে নামিল। সম্মুখে রাস্তার উপরেই একখানি বাড়ি; তাহার দাওয়ায় এক ব্রাহ্মণ খালি গায়ে বসিয়া ডাবা হুঁকায় তামাক খাইতেছিলেন। আবদুল্লাহ্ একটু

অগ্রসর হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, মশায়, গাড়ি যাবার কি আর কোনো পথ আছে?

ব্রাহ্মণটি একটু ঘাড় নাড়িয়া একটি উঁহুক শব্দ করিয়া ধোঁয়া ছাড়িলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তবে কী করি, মশায়, বড়ই মুশকিল হল তো!

ব্রাহ্মণটি কোনো উত্তর করিলেন না। রৌদ্রতাপে ক্লান্ত হইয়া আবদুল্লাহর বড়ই ইচ্ছা হইতেছিল, দাওয়ার উপর উঠিয়া বসিয়া একটু বিশ্রাম করে, কিন্তু গৃহস্বামীর দুজ্ঞেয় তুষ্ণীভাব দেখিয়া আর তাহার সাহস হইল না। অগত্যা সে রাস্তার পার্শ্বেই ছাতা খুলিয়া বসিয়া ব্যগ্রচিত্তে গাড়োয়ানের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।

কিয়ৎক্ষণ পরে গাড়োয়ান ফিরিয়া আসিয়া কহিল, হুজুর, আছে এট্টা পথ; কিন্তু সে এক ঠাহুরির বাড়ির পর দ্যে যাতি হয়। আপনি গে তানারে এট্টু করে বুলে দ্যাহেন যদি যাতি দেন।

এই কথায় কিঞ্চিৎ ভরসা পাইয়া আবদুল্লাহ গাড়োয়ানের সঙ্গে চলিল। সরুপথ দিয়া একটু গিয়াই দূর হইতে বাড়িখানি দেখাইয়া দিয়া গাড়োয়ান কহিল, ওই বাড়ি; ওই যে বটেখানা দ্যাহা যায়। আপনি যান, আমি গাড়ির কাছে থাকলাম।

আবদুল্লাহ্ গিয়া বৈঠকখানার বারান্দার উপর উঠিল। গৃহমধ্য হইতে শব্দ আসিল, কে?

আবদুল্লাহ্ কহিল, মশায়, আমি বিদেশী, একটু মুশকিলে পড়ে আপনার কাছে… বলিতে বলিতে ঘরে উঠিবার জন্য পা বাড়াইল।

টুপি-চাপকান পরিহিত অদ্ভুত মূর্তিখানি সটান ঘরের মধ্যে উঠিতে উদ্যত হইয়াছে দেখিয়া গৃহমধ্যস্থ লোকটি সত্রাসে হাঁ হাঁ, করেন কী, করেন কী, বাইরে দাঁড়ান, বাইরে দাঁড়ান বলিতে বলিতে তক্তপোশ হইতে নামিয়া পড়িলেন। আবদুল্লাহ্ অপ্রস্তুত হইয়া তাড়াতাড়ি পা টানিয়া লইয়া বারান্দায় সরিয়া দাঁড়াইলেন।

কী চান মশায়? সেই লোকটি দরজার গবরাটের উপর দাঁড়াইয়া দুই হাতে চৌকাঠের বাজু দুটি ধরিয়া, একটু রুষ্ট স্বরে এই প্রশ্ন করিলেন।

আবদুল্লাহ্ যথাশক্তি বিনয়ের ভাব দেখাইয়া কহিল, মশায় আমি গরুর গাড়ি করে যাচ্ছিলাম, গ্রামের মধ্যে এসে দেখি রাস্তার এক জায়গায় ভাঙা, গাড়ি চলা অসম্ভব। শুনলাম। মশায়ের বাড়ির পাশ দিয়ে একটা পথ আছে, যদি দয়া করে…

লোকটি রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, হ্যাঃ, তোমার গাড়ি চলে না চলে তা আমার কী? আমার বাড়ির উপর দিয়ে তো আর সদর রাস্তা নয় যে, যে আসবে তাকেই পথ ছেড়ে দিতে হবে…

আবদুল্লাহ্ একটু দৃঢ়স্বরে কহিল, মশায়, বিপদে পড়ে একটা অনুরোধ কত্তে এসেছিলাম, তাতে আপনি চটছেন কেন? পথ চেয়েছি বলে তো আর কেড়ে নিতে আসি নি। সোজা বললেই হয়, না, দেব না!

ওঃ, ভারি তো লবাব দেখি! কে হে তুমি, বাড়ি বয়ে এসে লম্বা লম্বা কথা কইতে লেগেছ?

লম্বা কথা কিছু কই নি মশায়, একটু অনুগ্রহ প্রার্থনা কত্তে এসেছিলাম। থাক, আপনাকে আর কোনো অনুগ্রহ কত্তে হবে না, মেজাজও খারাপ কত্তে হবে না–আমি বিদায় হচ্চি।

লোকটা গজর গজর করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ্ ফিরিয়া চলিল। তাহাকে বিষমুখে ফিরিতে দেখিয়া গাড়োয়ান কহিল, দেলে না বুজি? আমি জানি ও ঠাহুর ভারি ত্যান্দোড়। তবু আপনারে একবার যাতি কলাম, ভদ্দরলোক দেখলি যদি যাতি দেয়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, এস, এক কাজ করা যাক। জিনিসপত্তর গাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দেও গাড়ি নামিয়ে। তুমি এক চাকা ঠেল, আমি এক চাকা ঠেলি–গরুও টানুক, তা হলে গাড়ি ঠিক উঠে যাবে।

গাড়োয়ান একটু ইতস্তত করিয়া কহিল, আপনি এই হাবোড়ের মদ্দি নামবেন হুজুর?

তা কী করব! দায়ে ঠেকলে সবই কত্তে হয়। নেও আর দেরি কোরো না। এই বলিয়া আবদুল্লাহ বিছানা খুলিয়া একটা ময়লা ধুতি বাহির করিল, এবং পোশাক ছাড়িয়া মালকোচা মারিল। গাড়োয়ান তোরঙ্গ এবং বিছানা গাড়ি হইতে উঠাইয়া রাস্তার কিনারায় রাখিয়া দিয়া একটা গরুর লেজ মলিয়া এবং অপর একটার পিঠে পাঁচনবাড়ি কসিয়া র্‌-র্‌-র্‌ হেট্‌-হেট্‌ করিতে করিতে গাড়ি চালাইয়া দিল। ভাঙনের সেই খাড়া পাড়ের উপর দিয়া গাড়িখানা ধড়াস্ করিয়া কাদার ভিতর নামিয়া অনেকখানি বসিয়া গেল।

গরু দুটি একবার ডাইনে, একবার বায়ে আঁকিয়াৰ্বাকিয়া অগ্রসর হইবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু কাদা প্রায় তাহাদের বুক-সই; তাহার ভিতর হইতে পা টানিয়া উঠানো দুষ্কর হইয়া পড়িল। আবদুল্লাহ্ গাড়োয়ানের সহিত একযোগে প্রাণপণে চাকা ঠেলিতে লাগিল। কিন্তু ওপারেও তেমনি খাড়া পাড়, গাড়ি কিছুতেই উঠাইতে পারিল না। গরু দুইটা তো পূর্ব হইতেই ক্লান্ত হইয়াছিল; এক্ষণে ক্রমাগত লেজমলা এবং পাঁচনবাড়ি খাইতে খাইতে মৃতপ্রায় হইয়া সেই কাদার উপরেই শুইয়া পড়িল। গাড়োয়ান চিৎকার করিয়া উঠিল, হুমুন্দির গরু আবার বজ্যাত্তি লাগাল দ্যাহো! এবং আবার মারিবার জন্য ভীষণ আস্ফালনের সহিত পাঁচনবাড়ি উঠাইল। আবদুল্লাহ্ তাহাকে নিরস্ত করিবার জন্য তাড়াতাড়ি কহিল, আরে কর কী, মরে যাবে যে! আর পারেই-বা কত? মেরো না ওদের, এক কাজ কর। দেখ যদি দুই চার জন লোক পাওয়া যায়। পয়সা দেবখন–যা চায় তাই দেব বলে নিয়ে এসো।

গাড়োয়ান কহিল, এ হেঁইর গাঁ, এহানে কি মুনিষ্যি পাওয়া যাবি? যে গেরামডা এই পাছে থুয়ে আলাম, স্যানে পাওয়া গেলিউ যাতি পারে।

তবে তাই যাও, দেরি কোরো না।

গাড়োয়ান চলিয়া গেল। আবদুল্লাহ্ কাদা ঠেলিয়া উঠিয়া আসিল এবং ছাতাটি খুলিয়া সেই ব্রাহ্মণের দাওয়ার সম্মুখে রাস্তার উপরেই বসিয়া পড়িল।

ব্রাহ্মণটি উঠিয়া গিয়াছিলেন; কিছুক্ষণ পরে পান চিবাইতে চিবাইতে ডাবা হাতে আবার বাহিরে আসিয়া বসিলেন। আবদুল্লাহ্ ঘাড় ফিরাইয়া তাহাকে একবার দেখিয়া লইল, কিন্তু কোনো কথা কহিল না।

এদিকে দ্বিপ্রহর গড়াইয়া গিয়াছে–ক্ষুধায়, শ্রান্তিতে ও উদ্বেগে আবদুল্লাহ্ অস্থির হইয়া উঠিল। গাড়োয়ানের ফিরিতে কত দেরি হইবে, কে জানে? আবদুল্লাহ্ পথের দিকেই চাহিয়া আছে। অবশেষে প্রায় অর্ধঘণ্টা পরে দূর হইতে তিন-চারি জন লোক আসিতেছে দেখা গেল। গাড়োয়ান লোক লইয়া ফিরিতেছে মনে করিয়া আবদুল্লাহর ধড়ে যেন প্রাণ আসিল। ক্রমে তাহারা নিকটবর্তী হইলে আবদুল্লাহ্ দেখিল সে-ই বটে, তিনজন লোক সঙ্গে।

তাহারা আসিয়া কাদার ভিতর নামিয়া পড়িল। আবদুল্লাহ্ নামিবার উপক্রম করিতেছিল, কিন্তু তাহারা কহিল, আপনি আর নামবিন ক্যান হুজুর? আমরাই ঠেলে দি তুলে–আপনি বসেন। গরু দুইটি কাদার ভিতর শুইয়া শুইয়া এতক্ষণে একটু বিশ্রাম করিয়া লইয়াছে। গাড়োয়ানের পাঁচনবাড়ির দুটা খোঁচা খাইয়াই তাহারা উঠিয়া পড়িল। চার জন লোকে চাকা ঠেলিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ি ওপারে তুলিয়া ফেলিল। আবদুল্লাহর জিনিসপত্রগুলিও তাহারা তথায় মাথায় করিয়া পার করিয়া দিয়া আসিল।

আবদুল্লাহ্ তাহাদিগকে কহিল, তোমরা আজ আমার বড় উপকার কল্লে বাপু না হলে আমার যে আজ কী উপায় হত তার ঠিক নেই। এদের কত দেবার কথা আছে। গাড়োয়ান?

গাড়োয়ান কহিল, আমি পুস্ কছিলাম, কত লেবা; তা ওরা কলে খুশি হয়ে যা দেন, আমরা আর কী কব!

আবদুল্লাহ্ একটি টাকা বাহির করিয়া দিল। তাহারা খুশি হইয়া সালাম করিয়া চলিয়া গেল।

যাইবার পূর্বে আবদুল্লাহ্ সেই ডাবা-প্রেমিক ব্রাহ্মণটির দিকে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল ঠাকুরমশায় তাহাদের দিকেই তাকাইয়া আছেন এবং সুস্থচিত্তে ধূমপান করিতেছেন।

গ্রন্থাবলী
মতামত জানান